বাংলা বর্ষবরণ – অমঙ্গল শোভাযাত্রা ?
হাসান মাহমুদ
১৪ই এপ্রিল পহেলা বৈশাখের শোভাযাত্রা আমাদের রাজনীতি ও ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালিয়ানা-উৎসব। ইউনেস্কো ৩০ নভেম্বর ২০১৬ তারিখে আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রাকে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে এটা আমাদের গর্ব এবং তাঁদের বুক চাপড়ানো মাতম, মাথায় বজ্রাঘাত। ১৯৮৯ সালে এতে মানুষের এবং কিছু প্রাণীর মুখোশ যোগ হয়েছে যেমন প্যাঁচা, বাঘ, সিংহ, ময়ূর, মাছ ইত্যাদি। আয়োজকদের দাবি ওগুলো নিছক বাঙালিয়ানা, কোনো ধর্মের সাথে এর সম্পর্ক নেই। এর বিপক্ষে দাবী, মঙ্গল শোভাযাত্রার ভেতরে অমঙ্গল আছে, “মঙ্গল” শব্দটা নাকি হিন্দুয়ানী। মানে কি ? আমরা কি পরস্পরের মঙ্গল কামনা করব না ? সপ্তাহে দিনের নাম থেকে মঙ্গলবার উঠিয়ে দিতে হবে ? মঙ্গলগ্রহের নাম বদলাতে হবে? এইসব উদ্ভট কথাবার্তার মানে কি ?
যুক্তি সবারই থাকে। গণেশের বাহন ইঁদুর এবং সাপ ইঁদুর খায় তাই সাপকে “হিন্দু বিরোধী” বা “ইসলাম প্রেমী” দাবিরও “যুক্তি” আছে। একাত্তরে যে মওলানা পীর বলেছিল আমাদের হিন্দু বোনেরা নাপাক আর্মির জন্য হালাল তারও যুক্তি ছিল (সহী বুখারী তাওহীদ পাবলিকেশন হাদিস ৫২১০ ও সূরা মুমিনুন ৫, ৬ ইত্যাদি)। যা ছিলনা তা হল দলিল প্রয়োগের প্রজ্ঞা। শোভাযাত্রার মুখোশগুলো হিন্দু ধর্মের সাথে সম্পর্কিত? ওগুলোর ব্যবহার জাতিকে ইসলাম-ভ্রষ্ট করার সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্র? এই উদ্ভট দাবীটা তাঁরা কোন গবেষণায় পেয়েছেন? দাবী করছি, শোভাযাত্রায় মুখোশ যোগ করার পর থেকে গত বছরগুলোতে মুখোশের কারণে কে কে ইসলাম ত্যাগ করে হিন্দু হয়েছে, নাম ঠিকানা সহ সেই তালিকা দেখান। দেখাতে না পারলে তাঁদের দাবীটা ডাঁহা মিথ্যা ও আমাদের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। এই ষড়যন্ত্রের জন্য তাঁদের এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত যাতে ভবিষ্যতে কেউ ইসলামকে জাতির সংস্কৃতির বিরুদ্ধে দাঁড় করার স্পর্ধা না দেখায়।
তাঁরা কি জানেন না ওই প্রাণীদের অস্তিত্ব হিন্দু ধর্মের বাইরেও ব্যাপক? তাঁরা কি জানেন না, যে রাজহাঁস আমরা জবাই করে খাই সেটা সরস্বতীর বাহন নয়, যে মোষের পিঠে ছোটবেলায় ঘুরে বেড়িয়েছি সেটাও মহিষাসুর নয়, চিড়িয়াখানার ময়ূরটাও কার্তিকের বাহন নয়, শিশুশিক্ষার বইতে প্যাঁচার ছবিও লক্ষ্মীর বাহন নয়? তাঁরা কি জানেন না শোভাযাত্রায় মানুষ প্যাঁচাকে প্যাঁচাই দেখে দেবীর বাহন হিসেবে দেখে না। তাছাড়া দেবতার সংশ্লিষ্ট প্রাণীর প্রতিমা নিখুঁত করে বানাতে হয়, নাহলে সেটা পুজোর জন্য গ্রহণযোগ্যই হবে না। মঙ্গল শোভাযাত্রার মুখোশগুলো কার্টুনের মত, ওগুলোকে জবরদস্তি টেনে হিচড়ে হিন্দু ধর্মের সাথে সম্পর্কিত করে তোলাটা অবশ্যই আমাদের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক। এর জন্য তাঁদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত।
আসলে মঙ্গল শোভাযাত্রা তাঁদের “মঞ্জিলে মকসুদ”-এ পৌঁছনোর পথের কাঁটা। সেই “মঞ্জিলে মকসুদ” হল “ইসলামী রাষ্ট্র” প্রতিষ্ঠা যা বাঙালীয়ানাকে হত্যা না করে সম্ভব নয়। এজন্যই তাঁদের কম্পাসের কাঁটা মধ্যপ্রাচ্যের দিকে নিবদ্ধ। সেটা এতটাই যে তাঁরা নিজেদের নৃতাত্বিক শেকড়কে পর্যন্ত অস্বীকার করেন।
১. “বাংলাদেশী জনগণ মূলত: সেমিটিক দ্রাবিড়। সেমেটিকদের আদিনিবাস আরব ভূখণ্ড থেকেই তারা এসেছে। সুতরাং এই মানবগোষ্ঠী যদি নৃতাত্ত্বিক পণ্ডিতদের মতেই দ্রাবিড় হয়, আর দ্রাবিড় যদি আরব হয় তদুপরি আরব যদি সেমেতিক হয়তবে এ অঞ্চলের জনগণ যে সেমেটিক আরবগোষ্ঠীরই অধ:স্তন পুরুষ তাতে আর সন্দেহ কি? ……. খোদ বাংলা শব্দটি আরবী শব্দমালার পরিবর্তিত রূপ”- দৈনিক ইনকিলাব ১২ নভেম্বর ২০০৭ – সম্পাদকীয় “ইসলামী দল নিষিদ্ধের বায়না ও যুদ্ধাপরাধী প্রসঙ্গ”-এর অংশ।
২.“নুহ (আ:)- এর এক পুত্র হ্যাম এশিয়া অঞ্চলে বংশবৃদ্ধিতে মনোনিবেশ করেন। হামের পুত্র হিন্দ-এর নামানুসারে “হিন্দুস্তান”, সিন্দ-এর নামানুসারে “সিন্দুস্থান” বা “সিন্ধু” এবং হিন্দ-এর পুত্র বঙ্গ-এর নামানুসারে বঙ্গদেশ।…. তাহলে বলতে আর বাধা নেই নুহ (আ:)-এর পুত্র বা নাতির নামানুসারে বঙ্গ বা বাংলাদেশ”- ইনকিলাব ২৫শে জুন ২০০৮ – “ফিচার” পৃষ্ঠায় নিবন্ধ – “বাংলার ইতিহাসের পটভুমি”-র অংশ বিশেষ।
ধর্মীয় আবেগ কতটা অন্ধ কতটা উদগ্র হলে এমন বলে কেউ? যারা তাঁদেরকে অপমান করে “মিসকিন” বলে তাদের পরিচয়ে পরিচিত হয়ে গর্বিত হবার চেষ্টা করে কেউ? এই সেই আত্মঘাতী ধর্মান্ধতা, এর বিরুদ্ধেই কোরান রসূল (স) মুসলিমদেরকে সতর্ক করেছেন বারবার।
আসল কথাটা বলি এবারে। আসলে তাঁদের চরম সমস্যা বাংলাদেশের জন্মের মধ্যে। বাংলাদেশের জন্মই হয়েছিল বাহান্ন’র ভাষা আন্দোলনের বীজ থেকে জন্ম নেয়া আমাদের ভাষাভিত্তিক বাঙালীয়ানা থেকে। সেই বাঙালীয়ানাকে হত্যা না করলে বাংলাদেশকে তথাকথিত “ইসলামী রাষ্ট্র” বানানো অসম্ভব। সেজন্য তাঁরা বই লিখেছেন “ভাষাভিত্তিক ও সাংস্কৃতিক জাহেলীয়াতের পরিণতি” – সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদবী, অনুবাদ আবদুল মান্নান তালিব, প্রকাশক সিন্দাবাদ প্রকাশনী, ২ কাজী আলাউদ্দীন রোড ঢাকা। বাংলাদেশ বিরোধী এই অপতত্বটি মৌদুদীও লিখেছেন তাঁর “ইসলাম ও জাতীয়তাবাদ” বইতে। তিনি লিখেছেন ইসলামী জাতীয়তাবাদ ছাড়া বাকী সব জাতীয়তাবাদের ভিত্তি হল বর্ণের, স্বদেশের ও ভাষার ঐক্য এবং উদ্ধৃতি :-“এ ভিত্তিসমূহই যে গোটা মনুষ্যজাতির পক্ষে এক কঠিন ও মারাত্মক বিপদের উৎস হয়ে রয়েছে, তাও কেউ অস্বীকার করতে পারে না”।
অর্থাৎ আমাদের বাংলা ভাষা ভিত্তিক বাঙালিয়ানা “গোটা মনুষ্যজাতির পক্ষে কঠিন ও মারাত্মক বিপদের উৎস”, কাজেই বাঙালিয়ানাকে ধ্বংস করাটা উনাদের “ঈমানী দ্বায়িত্ব”। কারণ শারিয়া আইনে আছে:- “উদ্দেশ্য যদি বাধ্যতামূলক হয় তবে সে উদ্দেশ্যে মিথ্যা বলা বাধ্যতামূলক” – আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় দ্বারা সত্যায়িত শারিয়া কেতাব ‘উমদাত আল সালিক’ আইন নং r.8.2। এর ওপরে আবার আছে “তাকিয়া” পদ্ধতি যাতে ইসলামের নামে মিথ্যা বলাকে বৈধ করা আছে। এগুলো নির্লজ্জভাবে কোরান বিরোধী – “তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করো না এবং জেনে শুনে সত্য গোপন করো না” – সূরা বাকারা ৪২।
জাতির জানা দরকার তাঁরা “গোটা মনুষ্যজাতির পক্ষে কঠিন ও মারাত্মক বিপদের উৎস” থেকে রক্ষা করার সুমহান উদ্দেশ্যে আমাদের বাংলা ভাষা ভিত্তিক বাঙালিয়ানাকে হত্যা করার জন্য সূরা বাকারা আয়াত ৪২ কে জলাঞ্জলী দিয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রা সহ সব ব্যাপারে মিথ্যা বলছেন। মুখোশহীন শোভাযাত্রা তো ১৮৮৯-এর আগে পর্যন্ত ছিল কিন্তু তাঁরা কি কখনো শোভাযাত্রায় এসেছিলেন? আমি শোভাযাত্রার আয়োজকদের বলবো সামনের বছর আগে থেকে ঘোষণা দিয়ে মুখোশ বিহীন মঙ্গল শোভাযাত্রা করুন। জাতি দেখুক তাঁরা তাতে যোগ দেন কিনা। তাঁরা মুখোশ বিহীন শোভাযাত্রায় যোগ দিলে ভালো। যোগ না দিলে প্রমাণ হবে মুখোশের বাহানায় তাঁরা আমাদের বাঙালিয়ানাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করছেন।
প্রতিটি সংস্কৃতি বিবর্তিত হয়। আমাদের ছোটবেলায় একুশে ফেব্রুয়ারীতে শুধু ছুটি ছিল। পরে কোন এক সময় শোভাযাত্রা এসেছে, ভোরে খালি পায়ে শহীদ মিনারে ফুল দেয়া যোগ হয়েছে, তারও পরে শোভাযাত্রা যোগ হয়েছে – তারও অনেক পরে মুখোশ ইত্যাদি যোগ হয়েছে। মুখোশ একুশের কোনো জরুরী বিষয় নয়, এক সময় হয়তো ওটা থাকবেনা বা আরো কিছু যোগ হবে। এ নিয়ে এতো হৈ হৈ করার কি আছে, এতো উদ্বাহু ধেড়েনৃত্য করার কি আছে ?
নিজেদের সাংস্কৃতিক বৈভব যে কোনো জাতির গর্ব। অথচ আমাদের সাংস্কতিক অনুষ্ঠানে বোমা পড়ে যেখানে নারী-শিশু সহ নিরীহ লোকেরা থাকে। বুকের রক্ত ঢেলে নিজেদের সংস্কৃতিকে নিজেদেরই দানব থেকে রক্ষা করতে হয় এই উৎকট ও বীভৎস সমস্যাটা শুধু আমাদেরই আছে, দুনিয়ার আর কোন জাতির নেই। মুখোশের শুচিবায়ুতা থাকলে শোভাযাত্রায় না এলেই হয় – কেউ তো আসার জন্য জোর করছে না !
শেষ করছি লুৎফর রহমান রিটনের শক্তিশালী কবিতা দিয়ে :-
সমস্যা যদি হয় বৈশাখী মঙ্গলে–
লুৎফর রহমান রিটন
সমস্যা যদি হয় বৈশাখী মঙ্গলে,
তুমি চলে যেতে পারো প্রিয় কোনো জঙ্গলে।
তুমি চলে যেতে পারো দূর মরু সাহারায়,
বাঙালি রইলো তার সংস্কৃতি পাহারায়।
সংস্কৃতিসনে তুমি মিশিও না ধর্ম,
মেশাতে চাইলে সেটা হবে অপকর্ম।
ধর্ম ও সংস্কৃতি চিরকালই ভিন্ন,
সভ্যতা-ইতিহাসে তারই দ্যুতি-চিহ্ন।
(না মানুক অন্ধরা না জানুক উকিলে,
বসন্ত আসিবেই ডাকিবেই কুকিলে…)
বাংলা ও বাঙালির আনন্দ হর্ষ
বৈশাখ সমাগত শুভ নববর্ষ…
১১ এপ্রিল ২০২৩
******************************
Related – :- ২১শে, ২৬শে, ১৬ই উদযাপন কি শির্ক?
https://hasanmahmud.com/index.php/articles/islamic-bangla/151-2019-09-26-14-09-17
https://bangla.bdnews24.com/opinion/feature-analysis/52949